রবিবার । ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ । ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

সবজি বিক্রি করে সংসার চলে প্রতিবন্ধী মামুনের

আশিকুর রহমান মিলন

শারীরিক প্রতিবন্ধী মামুন হোসেন। টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে আর্থিক সংকটে সঠিক চিকিৎসার অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে তার দু’হাত ও পা। দু’হাতের কবজি থেকে বাঁকা। স্বাভাবিকের তুলনায় আকারেও ছোট। পা দুটিরও একই অবস্থা। কোনো বস্তু ধরা বা ভারি কোনো কিছু উঠাতে পারে না। এমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জীবনযুদ্ধ করে বেচে আছে মামুন। অন্যের কাছে হাত না পেতে কাঁচামালের ব্যাবসা করে জীবন জীবিকা চালাচ্ছেন তিনি।

মামুন হোসেনের বাড়ি বাগেরহাটের ফুলতা গ্রামে। বসবাস খুলনা মহানগরীর নিরালা ২৫ নম্বর সড়কের একটি বাসা। প্রতিদিন নিরালা আবাসিক রিয়াজুল জান্নাত জামে মসজিদের সামনে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করেন। মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লি ও আবাসিক এলাকার বাসিন্দারাই মামুনের ভ্যানের সবজির প্রধান ক্রেতা।

পাঁচ সদস্যের পরিবারে বাবা-মা ও মামুনসহ তিন ভাই। বাবা আনোয়ার হাওলাদার পেশায় রিকশা চালক, মা বাসা-বাড়িতে কাজ করে। পরিবারের বড় সন্তান মামুন। মামুনের মেজো ভাই দিনমজুরের কাজ করে। প্রতিদিন কাজ হয় না। ছোট ভাই চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। মামুনের বয়স যখন ৬ বছর, তখন সে টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে আস্তে আস্তে পঙ্গুত্ব বরণ করে। সুস্থতার জন্য অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েছেন তার বাবা-মা। কিন্তু কোনো প্রতিকার মেলেনি। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা ও থেরাপি নিয়ে কিছুটা হাঁটা-চলা করতে পারলেও টাকার অভাবে পরিপূর্ণ চিকিৎসা নিতে পারেনি।

মামুনের উপার্জিত অর্থ তার পরিবার চালাতে বড় ভূমিকা রাখে। একদিন আয় বন্ধ থাকলে পরিবারের সংসার চালনো কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়। সে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়া-লেখা করেছে। অসুস্থতার কারণে পড়া-লেখা চালিয়ে যেতে পারেনি। তার এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। অন্যের কাছে হাত পাতেন না, ভিক্ষা করেন না। সমাজের বোঝা না হয়ে ভ্যানে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সবজি বিক্রি করে সংসার চালাতে সাহায্য করছে। ভ্যানে করে বেগুন, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, শিম, ফুল কপি, পাতাকপি, মূলা, পটল, ঢেড়শ, ঝিঙে, কুশি, লালশাক, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি নিয়ে নিরালা মসজিদের সামনে প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বসে। ভিক্ষা না করে যতটুকু সামর্থ্য আছে তা কাজে লাগিয়ে জীবিকা নিবার্হ করায় তার প্রতি সহমর্মিতা দেখায় স্থানীয়রা।

নিরালা আবসিক এলাকার রিয়াজুল জান্নাত জামে মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম ও খতিব মুফতী আজিজুল ইসলাম বলেন, “মামুনের শারীরিক সমস্যার কারণে খরিদ্দারদের মালামাল দিতে তার অনেক কষ্ট হয়। তারপরেও আমরা তার কাছ থেকে পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করি। কারণ সে অন্যের উপর দারস্ত না হয়ে সততার সাথে ব্যাবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছে।”

তিনি আরও বলেন, “ইসলামে সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ হলো ভিক্ষা করা। কিন্তু সে এই কাজ থেকে অনেক দূরে রয়েছে। তাকে কেউ কোনো সাহায্য করতে চাইলেও সে নিতে চায় না। সে বলে আমি তো ব্যবসা করছি নেব কেন। এটা তার সবচায়ে বড় গুণ। যার কারণে আমরা সবসময় তার কাছ থেকে বাজার করার চেষ্টা করি।”

নিরালা অবাসিকের ১৮ নম্বর রোডের বাসিন্দা আবু বকর সিদ্দীক বলেন, “রাস্তায় বের হলে দেখা যায় কাজ করার মতো সামর্থ্য আছে এমন অনেকে ভিক্ষা করছে। অথচ শারীরিক প্রতিবন্ধী মামুন দৃঢ় মনোবল ও আত্ববিশ্বাস নিয়ে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।” তিনি বলেন, “যদি সু-চিকিৎসা ও কর্মসংস্থনের সুযোগ করে দেওয়া হয় তাহলে মামুনের মতো অনেকেই সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে না।”

মামুন হোসেন বলেন, “পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সময় মতো সঠিক চিকিৎসা নিতে না পারায় আজ আমার এই অবস্থা।” তিনি আরও বলেন, “মহানবীর (সাঃ) শিক্ষা, করোনা ভিক্ষা। তাই অসুস্থ শরীর নিয়ে কষ্ট হলেও এই ক্ষুদ্র ব্যাবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছি। অন্যের কাছে হাত পাতলে হয়ত ব্যবসার চেয়ে অনেক বেশি টাকা রোজগার করতে পারতাম। এতে অন্যের উপর করুনা করে বেঁচে থাকা হতো। তাই এই ক্ষুদ্র ব্যাবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছি।”

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন